বাংলা নাটক – দিশা

                                             

দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা দিশা

                                              দিশা

    লেখক – বিশ্বদীপ মূখাজ্জী

দুই টি দল ,

নবীন সংঘ         কান কাটা পাচু     উমাশঙ্কর বাবু

পল্টূদা                 উলুত                দিলিপ বাবু

ছোটমানা               চাকু বাপি

হারু

হাবি

কালা

শ্রাবণী

উজ্জ্বল

বিশ্বদীপ

কেষ্ট

মিডিয়া

গ্রুপ থিয়েটার খুব কঠিন । ভারতবর্ষের মত দেশে , পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে কলকাতার খুব নামি দামি কিছু দল ছাড়া বাকি সব দল কে ই খুব কঠিন আর্থিক অন্টনের  মধ্যে দিয়ে জেতে হয় । কিন্তু এই সব গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হীরের টুকরো । অভিনয়ের এক এক বিরল প্রতিভা । অধিকাংশ ক্লাব entertetment বলতে বোঝে তাস খেলা , ক্যারাম খেলা আর ক্লাবে বসে মদ খাওয়া কে । সুস্থ পরিবেশ তৈরি করাতে অধিকাংশ মানুষের যেন কোন দায় নেই । তার পর এখানে গ্রুপ থিয়েটার করে কোন পয়সা ও পাওয়া যায় না , চাকরি বা ব্যাবসা বা অন্য কোন পেশায় পয়সা রোজগারের পর এখানে গুটি কয়েক মানুষ আসে অভিনয়ের তীব্র খিদে নিয়ে , অভিনয় কে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালবেসে । সমাজ মুখ ফিরিয়ে নিলেও এই সব মানুষ যেন বদ্ধপরিকর সেই সমাজ কেই কিছু ফিরিয়ে দেবার জন্য ।পল্টুদা এমনই একজন, সমীর দা , মানে নবীন সংঘের আগের নির্দেশক সমীর পাল  মারা যাওয়ার পর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন নবীন সংঘের নির্দেশকের গুরু দায়িত্ব ।ছোটমানা , হারু , হাবি , এরা এক একটা নাটক অন্তপ্রাণ । কেউ বা জুটমিলে কাজ করে , কেউ বা লটারি বিক্রি করে , কিন্তু মন পরে থাকে ঐ রিহার্সালের ঘরে , এখানে এক একটি চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে নিজেদের সেরা টা উজার করে দেয় , এদের মনে টিভি সিরিয়াল করার ইচ্ছে বা হাতছানি কোনোটাই নেই , তবে ভাল অভিনয়ের তীব্র খিদে টা আছে । কিন্তু সমাজের উলটো পিঠ টা ও সমান সত্যি , মানে উলুত বা চাকু বাপির মত উঠতি মস্তান ও আছে তাদের সেই জায়গার দখল নিয়ে নেশা ভানের আড্ডা বসাবার তালে । তার মাথায় আছে কানকাটা পাচুর মত মস্তান ।কিন্তু সত্যের পথ যে কঠিন তা কে না জানে , তাই পল্টূদা দের গ্রুপের সঙ্গী হল ঘাম , রক্ত , আর পদে পদে বিপদ ।চেষ্টা করেও তারা বাঁচাতে পারেনা অনেকদিনের নবীন সংঘ ক্লাবঘর কে , তার পর শুরু হয় এক নতুন লড়াই , বড় শক্ত , বড় কঠিন এই লড়াই , দিলিপ বা উমাশঙ্কর বাবু ই বা কে ?  আসুন, তাদের ই কথা শুনি আমরা , দেখি লড়াই এর এই আগুনে তারা কি জলে পুরে ছারখার হয়ে যায় না লোহার মত পুড়ে নতুন রূপ ধারণ করতে পারে ……।।

( বাইরের থেকে আওয়াজ আসে ,

দুটি দলের মধ্যে গন্ডগোল , একদল একটি নাটকের দল , নাম নবীন সংঘ , আর একটির কোন নাম নেই , কিন্তু সবাই দল টাকে কুখ্যাত কান কাটা পাচুর দল বলে এলাকায় চেনে ।)

চাকু বাপি -মার শালাদের , শূয়রের বাচাগুলো বহুত বার বেড়েছে । নাটক মাড়াচ্ছে , নাটক । আজ এই কেলাব আমরা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেব। শালা , এই কেলাব থাকলে আমরা মদ গাঁজা কিছু খেতে পারব না । এই কেলাব ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দে । যে সামনে আসবে তাকে মায়ের ভোগে পাঠিয়ে দিবি । আমাদের পেছনে দাদা র হাত আছে, কোন চিন্তা নেই, মার শালা মার।

ছোট মানা – তোমরা যা খুশি কর , কিন্তু আমাদের ক্লাব টা ভেঙো না । আমাদের মারছ মার , এই আতপুরে নাটকের এইটুকু অস্তিত্ব ই তো পরে আছে , বাকি পুরোটাই তো তোমাদের । শুধু এইটুকু ছেড়ে দাও ।

উলুত – এই শুয়ারের বাচাগুলো , ভাল চাস তো এখান থেকে কাট , নইলে এগুলো দেখেছিস ? এফোঁড় ওফোঁড় করে দেব । দাদা বলে দিয়েছে , বেশি কালচার মাড়িয়েছ কি সোজা স্বগগে  , বুঝলে না ?

চাকুবাপি – মানে তোমরা তো ভাল ছেলে , ভাল ছেলেরা ভাল কাজ করে স্বর্গে যায় । তাই তোমাদের স্বর্গে পাঠিয়ে আমরা এই নরকে বসে নিশ্চিন্তে একটু নেশা ভান করব । ভাগ শালা ।

হারু – এই ক্লাব আমরা অনেক ঘাম রক্ত ঝরিয়ে তৈরি করেছি ভাই , এটা শুধু আতপুর না, সারা পশ্চিমবঙ্গের  গর্ব , সত্যি , তোদের তো সব ই আছে , চাইলে যে কোন জায়গায় গিয়ে তোরা বসতে পারিস , এই জায়গা টুকু ছেড়ে দে ভাই , তোদের কাছে জোড়হাত করছি ।

চাকু বাপি – আমরা ও তোর কাছে জোড়হাত করছি ভাই , এখান থেকে কাট না রে ।

উলুত – এই , এই বানচোদ টা কে রে ? শুয়োরের বাচ্চা টা বাংলা ভাষা বোঝে না , না কি ? বলছি না , এই জায়গা টা ই চাই ।

চাকুবাপি – ঘাম রক্ত ঝরিয়েছিস তো , দে রক্ত দে , আমার ভোজালি টা  অনেকদিন রক্ত খাই নি , নিশপিশ করছে , তোর রক্ত খেতে ( ভোজালি টা দেখিয়ে ) ওর খারাপ লাগবে না ।

উলুত – এই জায়গায় মধু আছে রে , মধু , চল , ফোট এখান থেকে ।

হাবি – কাজ টা কিন্তু তোরা ভাল করছিস না , এক মাঘে শীত জায়না , মনে রাখিস , যে দাদাদের ওপর  ভরসা করে আজ আমাদের সাথে এটা করছিস , সময় এলে ঐ দাদা কে ই একদিন খুঁজে পাবি না , শালা এই আতপুরে কত মস্তান দেখলাম ।

চাকুবাপি – এই বানচোদ টা কে রে ? বহুত বকছে তো , এত ডায়লগবাজি?

এই শুয়োরের বাচ্চা , এখানে ডায়ালগ  শুধু আমরা দিই , বুঝলি ।

উলুত – দেখ হাবি , আমি তুই  এক সাথে পরেছি , তাই এখন ও মেশিন বার  করিনি , কেন বুঝজিস না , না হলে এতক্ষণে লাশ পরে যেত ,  এই জায়গা টা আমাদের চাই , চল, চল পাতলা হ ।

মার খেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হারু , হাবি , ছোটমানা বেরিয়ে আসে ।

হাবি – ছেড়ে দে আমাকে , নিজে মরব তো শালা দু চারটে কে নিয়ে মরব ।

(ছোটমানা আর হারু আটকায় হাবি কে )

ছোটমানা – না হাবি না , যাস না ভাই , ওদের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে লাভ নেই । বুঝতে পারছিস না , ওদের পেছনে অশুভ শক্তির ইন্ধন আছে । চলে আয় ।

হারু – হা ভগবান , ভাল পথে থাকার এই কি পরিণাম ? আমরা এখন কোথায় যাব ? কি করব ? ( কান্না ) এই একটাই তো জায়গা , যেখানে আমরা নিজেদের সব দুঃখ দুর্দশা ভুলে এক হয়ে নিজেদের সেরাটা উজার করে দিই ।

হাবি – হ্যাঁ , আমাদের টাকার অভাব তো কোনোদিন ঘুচবে না , কোন কোনোদিন বউ বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে একবেলা না খেয়ে থাকার অভ্যাস ও হয়ে গেছে , কিন্তু এখানে আসলে মনের খিদে টা মিটে যায় । এরা আজ এটাও কেড়ে নিল ।

ছোট মানা – ছোটবেলা থেকে নাটক নাটক করে বাড়িতে কম মার খাইনি , এই ক্লাবের হয়ে কত শো , কত প্রাইজ , আর আজ ? কিছু ক্রিমিনালদের জন্য সব শেষ ?

হারু – ( চোখের জল মুছে ) এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না , একটা কাজ করলে হয় না ?

ছোট মানা , হাবি – কি ?

হারু – চল , সবাই মিলে পল্টূ দার কাছে  যাই । আজ সকালেই তো পল্টূ দার ফেরার কথা ।

ছোটমানা , হাবি – তাই চল , তাই চল ।

(তিনজনে বেড়িয়ে যায় ) ।

পল্টূ দার বাড়ি গিয়ে তিনজন পল্টূ দা কে ডাকতে থাকে ।

পল্টূদা , ও  পল্টূদা , পল্টূদা ।

পল্টূদা – কে রে ? ও তোরা ? তা কি ব্যাপার ? একেবারে দল বেঁধে ? সব ঠিক আছে তো ? একিরে ? এ কি অবস্থা তোদের ? এত রক্ত?

ছোটমানা – কিছু ঠিক নেই পল্টূদা , সব শেষ ।

পল্টূদা – মানে ?

হারু – হ্যাঁ গো পল্টূদা , তুমি তো ছিলেনা , কানকাটা পাচুর পুরো দল এসে আমাদের ক্লাব টা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়ে জায়গা দখল করে নিয়েছে । ওরা ওখানে নিজেদের ডেরা বেঁধেছে ।

ছোটমানা – সব কটা মেশিন আর ভোজালি নিয়ে এসেছিল ।

হাবি – ও সব আমি ভয় পাই না ।

ছোটমানা – এখন কি হবে গো পল্টূদা ?

পল্টূদা – আচ্ছা , তোরা আগে শান্ত হয়ে বস । এ তো অনেক জায়গায় কেটে গেছে ?

হাবি – কেটে যায়নি গো পল্টূদা , ভোজালি চালিয়েছে ।

পল্টূদা – তোরা কি পাগল ? হসপিটাল না গিয়ে এখানে এসেছিস ? আমাকে ফোন করে দিলে ই তো হত ।

ছোটমানা – তোমাকে ফোন করে পাইনি ।

পল্টূদা -ও তাই , তাহলে বোধহয় চার্জ শেষ , ঠিক আছে , তোরা হসপিটাল এ চল , এতো পুলিশ কেস । জঙ্গল রাজ নাকি যে , যে যা খুশি তাই করবে ।

হারু – পল্টূদা , বিশ্বাস কর , আমাদের কিছু চাই না , শুধু তুমি দেখ , আমাদের নাটক যেন বন্ধ না হয় ।

ছোটমানা – নাটকের জন্য আমরা জীবন দিতে পারি ।

পল্টূদা – ওরে পাগল , জীবন থাকলে তবে তো নাটক , ওসব কথা পরে হবে । আগে হসপিটাল এ চল।

( হসপিটাল থেকে চিকিৎসা করে ফেরার পথে )

কানকাটা পাচু – কিরে পোল্টে , তুই তোর দল বল নিয়ে রোজ একঘণ্টার নাটক দেখাস না ? তাই আজ আমরা তোদের তিন ঘণ্টার সিনেমা দেখালাম , থুড়ি , এটা তো ট্রেলার , বাকি সিনেমাটা ( চোখ মেরে ) তোলা রইল ।

এর পর যদি হর ঘোষ রোডের ঐ চত্বরে দেখি , তাহলে পুরো ৩ ঘণ্টার একটা বচ্চনের সিনেমা দেখাব ।

( হাবি তেরে যেতে চায় )

পল্টূদা বাধা দিয়ে বলে –  কোন দরকার নেই , চলে আয় সবাই ।

সবাই চলে যায় ।

( দিন কয়েক বাদে পল্টূদা সবাইকে নিজের বাড়িতে ডাকে )

হাবি – কি ব্যাপার পল্টূদা ? সবাইকে ডাকলে ?

পল্টূদা – সবাই এসে গেছিস ? কেষ্ট কোথায় ?

ছোটমানা – ও কি যেন সৎ সংঘে গেছে ।

হারু – শালা যেন মিনিস্টার , দেখা পাওয়া ই মুশকিল । যাকগে , তুমি বল , ডেকেছ কেন ?

পল্টূদা – আগে মুড়ি , পিঁয়াজি , সঙ্গে চা খা , তার পর কথা ।

হাবি – বুঝেছি ।

পল্টূদা – কি ?

হাবি – আজ মোহনবাগানের খেলা ছিল , জিতেছে , তাই পল্টূদা একেবারে তুরীও মেজাজে ।

পল্টূদা – সেটা একটা কারণ হলেও আসল কারণ …।

ছোটমানা – ধুর পল্টূদা , হেঁয়ালি করোনা তো , আমাদের মন মেজাজ ভাল নেই ,

পল্টূদা – এবার ভাল হয়ে যাবে ।

ছোটমানা – মানে ?

পল্টূদা – আমার বাড়ির উলটো দিকে ঐ যে মাধবী লজ ।

ছোটমানা – হ্যাঁ

পল্টূদা – ওখানে আমরা এবার রিহার্সাল করতে পারব । অবশ্য ওদের যেদিন যেদিন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া না থাকবে ।

হারু – পল্টূদা , তুমি তো ফাটিয়ে দিয়েছ গুরু ।

ছোটমানা – বিশ্বাস কর পল্টূদা , ( কান্না ) ঐ ঘটনার পর থেকে একটা রাত ও ভাল করে ঘুমোতে পারিনি । তুমি যা খবর দিলে তাতে মনে হয় অনেক দিন পর ভালো করে ঘুম আসবে ।

সবাই – থ্রি চিয়ার্স ফর পল্টূদা , হিপ হিপ হুররে , থ্রি চিয়ার্স ফর পল্টূদা , হিপ হিপ হুররে , থ্রি চিয়ার্স ফর পল্টূদা , হিপ হিপ হুররে ।

পল্টূদা – আমার কিন্তু একটা শর্ত আছে ।

সবাই – কি ?

পল্টূদা – রিহার্সাল কামাই করা চলবে না ।

ছোটমানা – কোন প্রশ্ন ই ওঠেনা ।

হারু- আমার ব্যাপারটা তুমি ভাল জান পল্টূদা ।

পল্টূদা – হ্যাঁ , তুই ৮ টায় আসবি তো ? দোকান বন্ধ করে । কিন্তু হারু , ৮ টা মানে ৮ টা । অনেক কষ্টে জায়গা জোগাড় করেছি ভাই , দেখ , যেটা আমাদের মূল মন্ত্র সেটা ভাল করে জপতে হবে ।রিহার্সাল ই সেই মন্ত্র জপার একমাত্র জায়গা । উৎসাহ তো শুধু কথায় হবে না ? কাজে ও সমান চাই । তাই না ?

হারু – অবশ্যই ।

হাবি – পল্টূদা – তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না ।

পল্টূদা – PROBLEM SOLVE ? যা , এখন বাড়ি যা । কাল ঠিক সন্ধ্যা  সাত টায় মাধবী লজে ।

সবাই – OK , DONE

( আতপুর বাজারের একটি লজ , লজটির নাম মাধবী লজ , সেখানকার দোতলায় আতপুর নবীন সংঘ ক্লাবের নাটকের রিহার্সাল )

কালা – কি রে কতক্ষণ ?

ছোটমানা – ঠিক সাতটা বাজতে পাঁচ মিনিট আগে এসেছি ।

কালা – আমার একটু দেরি হয়ে গেল ।

ছোটমানা – তোদের রোজ ই দেরি হয়ে যায় , চল , ওপরে চল ।

কালা – দাড়া , সাইকেল গুলো তালা দিতে হবে না ? আজ বৃহস্পতি বার , রাস্তা একেবারে শুনশান ।

ছোটমানা – দাঁড়িয়ে রয়েছিস কেন ? তালা টা মেরে ওপরে চল । লাইট জ্বালিয়ে বসি , রিহার্সাল শুরু করি ।

কালা – তুই যা , আমি যাচ্ছি ।

(ছোটমানা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায় । নাটকের রিহার্সাল দেবার সময় নির্ধারিত ছিল সন্ধ্যা 7 টায় , এখন 7.20 PM বাজে । কিছুক্ষণ বাদে কালা ও দোতলায় রিহার্সাল রুম এ উঠে আসে । আর ও দশ মিনিট বাদে আসে হাবি।

হাবি – বাকি সব কোথায় ?

 ছোটমানা – জানি না ।

হাবি – আমি কিন্তু ঠিক সময় এ এসেছি ।

ছোটমানা – ঠিক সময় এ এসেছিস ? এটা ঠিক সময় ? ঘড়ি টা দেখেছিস ? এখন 7.30 বাজে ।

হাবি – আমি 7 PM এ এসেছিলাম । কেউ নেই দেখে ভাবলাম ওষুধ টা নিয়ে আসি ।

ছোটমানা – ওষুধ নিয়ে আসি ?

হাবি – বৃহস্পতিবার ওষুধের দোকান খোলা তো ।

( পল্টূ দা , নাটকের DIRECTOR এর প্রবেশ । )

পল্টূ দা – কি রে ? শুরু কর , শুরু কর । তোরা এখন ও বসে গ্যাজাচ্ছিস ? ( কালা কে দেখিয়ে ) হ্যাঁ , তুই ফোনের মধ্যে ঢুকে বসে থাক ।

কালা – ( ফোন টা পকেটে রাখে ) ।

পল্টূ দা – আর সব কোথায় ? সাহিত্যিক আসেনি ?

ছোটমানা – না , তুমি জান না ? ওর আসতে 8.20 PM বেজে যায় ।

পল্টূ দা – কেষ্ট , কেষ্ট কোথায় ?

হাবি – সৎ সংঘে যায়নি তো ?

ছোটমানা – ওটা সৎ সংঘ না, ওটা অসৎ সংঘ ।

পল্টূ দা – সে যাই হোক । কেষ্ট র তো আজ আসার কথা ছিল । ও তো কাল নিজে ই বলল আজ 7 PM এর মধ্যে চলে আসবে ।

কালা – পুলিশ কোথায় ?

পল্টূ দা – পুলিশ বৃহস্পতিবার আসবে ।আজ আমি ওকে আসতে বারণ করে দিয়েছি । ওর রোজ রোজ দোকান বন্ধ করে আসবার দরকার নেই ।( কালা কে দেখিয়ে ) এই , কেষ্ট কে ফোন কর তো ।

কালা – ফোন করে……… রিং হচ্ছে , হ্যাঁ , তুমি কোথায় আছ ? কি ? বেরিয়ে পরেছ ? রাস্তায় আছ ? রাস্তায় আছে , আসছে ।

পল্টূ দা – মনে করলাম আজ একটু তাড়াতাড়ি রিহার্সাল শুরু করব , জানুয়ারি পরে গেছে , ফেব্রুয়ারির মধ্যে দুটো বই নামাবো । আদিম জননী তৈরি আছে , বাজিটা উঠলেই হয়ে যাবে । সবাই খাটলেই হয়ে যাবে ।

ছোটমানা – এটা কত সাল ?

পল্টূ দা – কেন ? 2023 পড়ল ।

ছোটমানা – এভাবে চলতে থাকলে আমি বলছি লিখে নাও , 2024 এর ফেব্রুয়ারিতেও বাজি র শো করা যাবে না ।

(কেষ্ট র প্রবেশ )

পল্টূ দা – কটায় রিহার্সাল এর টাইম ?

কেষ্ট – আমি বেড়িয়ে পরেছিলাম , হঠাৎ বাড়িতে একজন লোক এসে হাজির ।তুমি বল , যে এসেছে তার সঙ্গে দুটো কথা না বলে চলে আসা যায় ?

পল্টূ দা – তাহলে তুই কাল বললি কেন যে আজ 7 PM এ আসবি ?

কেষ্ট – আমি তো বেড়িয়ে পরেছিলাম ।

পল্টূ দা – তাহলে এরা কি দোষ করল ? এরা তো ঠিক টাইমেই এসেছে।

ছোটমানা – আমি এভাবে রিহার্সাল দেবনা ( এই কথা বলে ছোটমানা রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ) ।

( কয়েক মিনিট সবাই চুপ করে বসে থাকে )

পল্টূ দা – ছেড়ে দে , আজ আর রিহার্সাল হবে না ।

( সবাই একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ) ।

( দু-দিন পর রিহার্সাল রুম এ হারু আর ছোটমানা ছাড়া সবাই আছে , পল্টূ দা শ্রাবণী কে বলে ছোটমানা কে ফোন করতে ) ।

শ্রাবণী – ছোটমানা দা , তুমি কোথায় ? কাছে ই আছ ? আমরা সবাই রিহার্সালে । তুমি এস , কি আসবে না ? ছাড় , যা হওয়ার হয়ে গেছে, চলে এস , পল্টূ দা ডাকছে ।হ্যাঁ , চলে এস । (ফোন রেখে) আসছে ।

(ছোটমানা র প্রবেশ )

পল্টূ দা – আয় , বস ।

ছোটমানা – রিহার্সাল পরে , আগে তুমি সবার সাথে কথা বল , টাইম ঠিক কর ।এভাবে চলতে পারে না । কেষ্ট দা র সাথে কথা বল । যখন ই রিহার্সাল তখন ই ওর বাড়িতে লোক আসে । এভাবে চলতে পারে না । হারুর ব্যাপারে আমরা জানি , ও দোকান বন্ধ করে 8 PM এর আগে আসতে পারে না , আমরা মেনে নিয়েছি ।

পল্টূ দা – সে তো ঠিকই , এভাবে চলতে থাকলে সত্যি বাজীর শো ফেব্রুয়ারিতে করা যাবে না কিন্তু ।

ছোটমানা – ফেব্রুয়ারি ? কালা র এখন ও পাঠ ই মুখস্থ হয় নি ।

পল্টূ দা- সত্যি , তুই কি করছিস বলতো ? পাঠ টা মুখস্থ করছিস না কেন ? তুই তো পুরো ডুবিয়ে দিবি ।

( হারু র প্রবেশ)

হারু – সব থেকে বড় কথা , তোমার ডায়ালগ থ্রো একেবারে ই হচ্ছে না । তুমি রাস্তা ঘাটে দেখতে পাও না তোতলা রা কেমন ভাবে কথা বলে ? অত আস্তে ডায়ালগ বলছ কেন ? স্কেলে ম্যাচ করছে না ।

পল্টূ দা – সত্যি , তোর ডায়ালগ গুলো কেমন যেন হচ্ছে । ঘড়ি দেখছিস কেন ? ফেরিঘাটে মদ খেতে  যাবি বুঝি ? তা এলি কেন ? ওখানেই থাকলে পারতিস ?

কালা – ধুর , কি যে বল , নাও , রিহার্সাল শুরু কর ।

রিহার্সাল তো করব ই , করব বলেই তো এখানে এসেছি , কিন্তু তোরা যখন খুশি নিজেদের মত এখানে আসবি , তাহলে বই উঠবে ?

হাবি – নাও, নাও , শুরু কর , এবার থেকে সবাই টাইমে আসবে ।

পল্টূ দা – নে , শুরু কর ।

ছোটমানা – কালার টা ভাল করে তোলাও , ওর প্রচুর ভুল ।

 পল্টূ দা – হ্যাঁ , আমার কথা ভাল করে শোন । আমরা দুটো বই তুলছি , একটা আদিম জননী , আর একটা বাজি , আদিম জননী তে আমরা সবাই আছি , শুধু হারু আর বিশ্বদীপ নেই , তাই আমি আদিম জননীর রিহার্সাল এর দিন বিশ্বদীপ কে আসতে বারণ করে দিয়েছি । রিহার্সাল সবার জন্য । হারু আর বিশ্বদীপ এলে আসবে । কিন্তু জোর নেই । কিন্তু বাজীর  রিহার্সাল অনেক বেশি করে প্রয়োজন । বাজী বই টার কিছু ই হয় নি । এখন ও অর্ধেকের পাঠই মুখস্থ হয় নি । দাঁড়িয়ে রিহার্সাল দেওয়া শুরু হয় নি ।

ছোটমানা – জগদ্দল উৎসব এর কথা টা বল , সবাই জানে ?

পল্টূ দা – হ্যাঁ , এবারে জগদ্দল উৎসবে আমাদের দুটো নাটক করতে বলেছে । তাছাড়া সামনে বাৎসরিক উৎসব আছে । আমরা তো পাড়ার ক্লাবে নাটক করা দল নই , আমরা নাটকের প্রফেশনাল দল , তার যদি এই অবস্থা হয় ।

হারু – তাছাড়া এত পুরোনো ক্লাব হওয়া সত্ত্বেও আজ আমাদের কোন ক্লাব ঘর নেই । সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে । পল্টূ দা বলে কয়ে আতপুর বাজারের মত জনবহুল জায়গায় এই অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া দেওয়া লজে রিহার্সাল করার পারমিশন জোগাড় করেছে শুধু নিজের পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ।

ছোটমানা – না হলে এই শীতের রাতে আমরা রিহার্সাল দিতাম কোথায় ? রাস্তায় দাঁড়িয়ে ?

কেষ্ট – সে তো ঠিক ই ।

ছোটমানা – সব বোঝো তো রিহার্সাল এ ঠিক সময় আসো না কেন ?

হাবি – আমরা নাটককে ভালোবাসি ।

পল্টূ দা – আমি ও সেই কথা ই বলছি , আমরা সবাই নাটক ভালোবাসি বলেই তো কাজ কর্ম সেরে আর অন্য কোথাও না গিয়ে এখানে আসি , সেটা তো খুব ই ভাল , কিন্তু সব কিছু র তো একটা সময় আছে । রিহার্সাল এর টাইম 7 PM থেকে 9 PM , এর মধ্যে আমাদের সব কিছু করতে হবে ।

কালা – আচ্ছা , এটা 8 PM থেকে  10 PM করা যায় না ? তাহলে তো সবাই চলে আসবে । রিহার্সাল ও অনেকক্ষণ দেওয়া যাবে ।

ছোটমানা – এই শীতের রাতে 8 PM থেকে  10 PM রিহার্সাল দিবি ?

কালা – হ্যাঁ , তাহলে 8 PM এ তো সবাই চলে আসবে ?

পল্টূ দা – তখন সবাই 8.30 PM এ আসবে ।

হাবি – না না , সময় এই থাক ।

ছোটমানা – নিজেরা সিন্সিয়ার না হলে কিছু হবে না ।

পল্টূ দা – নে , অনেক হয়েছে । সবাই বুঝে গেছিস , প্রতিদিন রিহার্সাল সেরে বেরোবার সময় হুলদা কে জিজ্ঞেস করে বেরোতে হয় কবে আবার লজ ভাড়া নেই , তবে আবার রিহার্সাল দিতে পারব । লজ ভাড়া থাকলে তো রিহার্সাল দেওয়া যাবে না । এত কিছু জানার পর ও তোরা যদি সিরিয়াস না হোস , আমার আর কি করার থাকে বলতো ।

হাবি – তাই তো , আমি তো আগের সপ্তাহে ডিউটি অফ করে রিহার্সাল এ এসেছি । অয়েভারলি জুটমিলে কাজ করি , মিল বন্ধ , তাই অন্য মিলে ঢুকেছি , নিজের মিল হলে বলে কয়ে টাইম অ্যাডজাস্ট করা যায় । অন্য মিলে কাজ পেয়েছি এই ভাগ্যি , না হলে সংসার চলবে কোথা থেকে ? এই অবস্থায় গত সপ্তাহে আদিম জননী র শো ছিল বলে সেদিন ডিউটি কামাই হল ।

কেষ্ট – সে তো আমার ও প্রচুর অসুবিধা ……।

পল্টূ দা – আমি জানি , সবার অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক কষ্ট করে এখানে আসি । শুধু একটু টাইমে আয় ।

হাবি – হ্যাঁ হ্যাঁ , এবার থেকে সবাই রিহার্সালে টাইমে আসব । শুরু কর ।

পল্টূ দা – এই কালা , আগের দিন যেখান থেকে শেষ হয়েছে , আজ সেখান থেকে ধর ।

কালা – কোথা থেকে ?

পল্টূ দা – আগের দিন যেটুকু বাকি ছিল , সেটা আগে শেষ করে নিই ।এখান থেকে বল …। ” জানিস , আমি ভে-ভেবে  দেখলাম……।

কালা – ” জানিস , আমি ভে ভেবে দেখলাম , আমি তো তোতলা ।

পল্টূ দা – তোতলাতে তোতলামি আছে ।

কালা – আচ্ছা , ” আমি তো তো ৎ লা , বাবার মো তো মো নতর তো উচ্চারণ করতে তো পারব না ।

পল্টূ দা – তোকে রোজ এক ই কথা বলতে হয় কেন রে ?

কালা – কেন , কি হল ?

পল্টূ দা – কি হল মানে ? মত বল মো তো না , মন্ত্র বল মো নতর না । আর নিজের মত এতবার তো লাগাচ্ছিস কেন যেখানে খুশি ? বাড়িতে বই টা পড়িস না না কি? অত সোজা নয় ।

কালা – আচ্ছা , নাও , ঠিক হয়ে যাবে ।

পল্টূ দা – ভাল করে শুনে নে , তারপর বল । ” জানিস , আমি ভে ভেবে দেখলাম , আমি তো তো ৎ ৎ লা , বাবার মত মন্ত্র উ উ উচ্চারণ করতে পারবো না । – বল

কালা – ” জানিস , আমি ভে ভেবে দেখলাম , আমি তো তো ৎ ৎ লা , বাবার মো তো তো মো ন্ত্র তো

পল্টূ দা – ক্যালানে , শুনে ও ভুল বলছিস ? ওরে , হাগো মো তো না , মত , মত , মন্ত্র , মো ন্ত্র না মন্ত্র ।

কালা – মত , মন্ত্র ।

পল্টূ দা- হ্যাঁ , এবার বল ।

কালা – ” বাবার মত তো মন্ত্র তো উচ্চারণ “

পল্টূ দা – আবার তো ? এতগুলো তো আছে ?

ছোটমানা – একটা সংশোধন হয় তো আর একটা ভুল করে ।

কেষ্ট – তোমার পাঠ টা খুব কঠিন ।

পল্টূ দা – কি ভাবে ডায়ালগ বলছিস , একটা CATCHING হচ্ছে না ।

কালা – হয়ে যাবে , আসলে রিহার্সাল টা কম হচ্ছে তো , ইকো গুলো মনে থাকছে না , আমার সব মুখস্থ ই আছে ।

পল্টূ দা – ইকো টা আবার কি ?

ছোটমানা – ও তোৎলামি টাকে ইকো বলে । মাঝে প্রথম দিকটা ভাল মুখস্থ করেছিল , এখন সেটা ও ভুলে গেছে ।বাড়িতে দেখিস না কেন ? এত সোজা না , তোর পাঠ টা খুব কঠিন , কেষ্ট দা ঠিক ই বলেছে , বাড়িতে রোজ PRACTIC না করলে হবে না ।

পল্টূ দা – ছোটমানা ঠিক ই বলেছে , 2024 এ ও হবেনা ।

(উজ্জ্বলের প্রবেশ )

কেষ্ট – এই তো সাহিত্যিক এসে গেছে ।

পল্টূ দা – উজ্জ্বল , তুই একটু তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা কর না ।দেখ এখন 8.20 PM বাজে ।

উজ্জ্বল – আসলে আমার মিসেস কম্পিটেটীভ পরতে যায় তো , তাই ফেরার সময় ওকে নিয়ে বাড়িতে রেখে তারপর আসি । তাই একটু দেরি হয়ে যায় ।

পল্টূ দা – “আমি শশাঙ্ক গোস্বামী ,”

 উজ্জ্বল – “আমি শশাঙ্ক গোস্বামী , আগে কবিতা লিখতাম , এখন উপন্যাস লিখছি ,

কালা – এই কেলে , সেটা কোথায় বে ?

পল্টূ দা – এই ক্যালানে , এখানে তোর এই ডায়ালগ আছে ? কোন সেন্স নেই ।

কালা – কি যেন ? ও হ্যাঁ , ” সাহিত্যিক “।

পল্টূ দা – তুই স্টেজে ও এরকম করবি ? ভুল ডায়ালগ বলবি ? তোর জন্য আমাদের……।

হারু – আমাদের সবাই কে ……।।

ছোটমানা – ক্যালানি না খেতে হয় , বানচোত ।

পল্টূ দা – একে নিয়ে তো মহা মুশকিল ।

কালা – হে হে হে

হাবি – ভুল করে আবার হাসছিস ? কি রে ?

পল্টূ দা – ভাল করে বোঝ , এটা আদিম জননী না , যে সবাই মিলে উতরে যাবি , এখানে INDIVIDUAL প্রত্যেক টা CHARACTER এর ভূমিকা বিরাট ।

ভুল করে হাসছিস মানে তুই SERIOUS না । এরকম করলে হবে না । একটা উচ্চারণ ঠিক না , কি বলছিস লোকে কিছু ই বুঝবে না । সব ডায়ালগ এক ই রকম হয়ে যাচ্ছে ।

হারু – আমাকে এবার উঠতে হবে ।

পল্টূ দা – কেন ? কটা বাজে ? 9 PM  বেজে গেছে ?

হারু – হ্যাঁ , লটারির টিকিট আনতে যাব ।

পল্টূ দা – কতটুকু সময় পেলাম রিহার্সালের বল ? তোরা একটু সিরিয়াস হলে ই বই টা উঠে যাবে । চল , সবাই যাওয়া যাক ।

( সবাই বেরিয়ে যায় )

( পরের রিহার্সালের দিন )

রিহার্সাল রুম এ ছোটমানা আর কালা প্রবেশ করে , তারপর পল্টূদা , এমন সময় হাবি সঙ্গে একজনকে নিয়ে প্রবেশ করে ।

হাবি – পরিচয় করিয়ে দিই , ইনি হলেন স্বপন দা , স্বপন নন্দী , থাকেন গোল ঘর কোয়ার্টার এ । আর স্বপন দা , ইনি হলেন আমাদের নাটকের DIRECTOR , সবার প্রিয় , পল্টূ দা । ভাল নাম সমীর ব্যানাজ্জ্রি।

কালা – হ্যাঁ , আমাদের নাটকের PRODUCER , DIRECTOR , FINANCER , সব , হে হে ।

ছোটমানা – এই , চুপ কর , সব সময় বাজে বকবি না ।

( শ্রাবণী প্রবেশ করে , একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে , নিজের স্ক্রিপ্ট খুলে দেখতে থাকে  )।

পল্টূ দা – বলুন ।

স্বপন – আসলে শখ ছিল বহুদিনের , নাটকে অভিনয় করব , তাই আসা ।

পল্টূ দা – আসলে গ্রুপ থিয়েটার একটা আন্দোলন । খুব কঠিন রাস্তা , অনেক কষ্ট করতে হয় । ত্যাগ স্বীকার করতে হয় । আমরা তো টাকা পাইনা , উল্টে নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিতে হয় । ঠিক আছে , ভাল তো , আসুন , রিহার্সাল দেখুন , যেদিন যেদিন রিহার্সাল থাকবে হাবির কাছে জেনে নেবেন ।

স্বপন – ঠিক আছে ।

পল্টূ দা – শ্রাবণী , ভাল হয়েছে আজ তুমি একটু তাড়াতাড়ি এসেছ ।

শ্রাবণী – হ্যাঁ , বলুন ।

পল্টূ দা – বাজীতে তোমাকে যে টুকু পাঠ দিয়েছি , বাড়িতে PRACTIC করছ ?

শ্রাবণী – একদম সময় পাইনি পল্টূ দা , হাড়ভাঙা পরিশ্রম চলছে । চাকরি টা তো রাখতে হবে বলুন ?

পল্টূ দা – আচ্ছা , এখান থেকে বল , ” জানিস খোকা “

শ্রাবণী – ” জানিস খোকা , একদেশে এক রাজা ছিল । একদিন একদল রাক্ষস এলো । সেই দেশে সবাইকে পাথর করে রেখে দিল , কেবল রাজকন্যাকে সোনার কাঠি রুপোর কাঠি ছুঁয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখল ।

পল্টূ দা – আর ও দরদ দাও । ঠিক আছে , তুমি বাড়িতে একটু PRACTIC করার চেষ্টা কর ।

শ্রাবণী – আমি যত ভাল ই করি না কেন , আপনি সব সময় বলেন আমার অভিনয় না কি হচ্ছেনা ।

পল্টূ দা – এখানে কেউ আমার ব্যক্তিগত শত্রু নয় ।

শ্রাবণী – আপনি এত চ্যাঁচামেচি করেন যে যে কেউ ঘাবড়ে যাবে । আমি তো আমার সাধ্যমতো করছি । আজ আমি আসছি পল্টু দা ।

পল্টূ দা – সাবধানে যেও ।

( শ্রাবণীর প্রস্থান ) ।

পল্টূ দা – এই কালা , তুই আগের দিন শ্রাবণী কে কি বলেছিলি রে ?

কালা – আমি বলেছিলাম , পল্টূ দার কথায় কিছু মনে করিস না । আসলে পল্টূ দা পুলিশে চাকরি করত তো ,সারা জীবন চোর ছ্যাঁচড় নিয়ে কারবার ছিল ,  এখন বয়স হয়েছে , তাই খিটখিটে হয়ে গেছে । পল্টূ দা শুধু তোর সাথে নয় , আমাদের সবার সাথে ই চিৎকার করে কথা বলে ।

পল্টূ দা – এসব উল্টোপাল্টা কথা বলে বেড়াবি না । তোদের পেছনে বক বক করতে করতে আমার শালা মুখ দিয়ে রক্ত উঠে যাবার জোগাড় আর তোমাদের কাছে আমি মজার খোরাক ? তাই না ? এবার থেকে আমি তোদেরকে কিছু বলা ই ছেড়ে দেব । তোরা যা পারিস কর ।

কালা – সেই ভাল , আমরা যে যা পারি তাই করব। হে হে হে

হাবি – ওরে মূর্খ , তুই চুপ কর । পল্টূ দা এভাবে আদা জল খেয়ে না লাগলে আমাদের নাটক উঠবে ?

ছোটমানা – তুই কাল রিহার্সাল এ এলিনা কেন ?

কালা – আমি তো ইলেভেন্থ আওয়ারে বলিনি , অনেক আগে ই বলে দিয়েছিলাম যে আমি গতকাল আসতে পারব না । আমার একটা বিশেষ কাজ আছে ।

ছোটমানা – তোর বিশেষ কাজটা তো আমি দেখে এলাম , মন্দিরে বসে পয়সা গুনছিলি ।

কালা – যেটা জান না সেটা নিয়ে কথা বল না । ওটা মন্দিরের টাকা , একটা দুঃস্থ মেয়ের বিয়ের জন্য মন্দির থেকে INTEREST এ দেওয়া হবে । কাল ঐ কাজ টা করতে ই হত।

ছোটমানা – দুঃস্থ মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা দিবি মন্দির থেকে তাও আবার INTEREST এ ?

হাবি – ওটা তো অন্যসময়েও করতে পারতিস ।

কালা – না , একটা মেয়ের বিয়ে বলে কথা , অন্য সময় করা যেত না । আমি রিহার্সাল কামাই করি না , একটা দিন …।

পল্টূ দা – ঐ একটা দিন করে ই তো সবার অসুবিধা হচ্ছে । সবার ই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একদিন অসুবিধা । রিহার্সাল এর দিন ঠিক একজন করে মিসিং , তাই দাঁড়িয়ে রিহার্সাল আর হচ্ছে না । যেমন আজ দেখ , কেষ্ট আসেনি , কেষ্ট রোজ ই আসে , শুধু আজ ই ওর অসুবিধা । আমাদের দলের এটা দেখছি একটা তুক হয়ে দাঁড়িয়েছে । যে দিন রিহার্সাল ঠিক সেদিন কেউ না কেউ কামাই করবেই । সে ইচ্ছাকৃত  হোক বা অনিচ্ছাকৃত , হচ্ছে তো শেষ অবধি নাটকের ক্ষতি , রিহার্সালের ক্ষতি ।

হারু – অথচ একটা সময় এরকম ছিল না । আমাদের নবীন সংঘের নাম শুনলে অনেক ভাল ভাল নাটকের দল কম্পিটিশনে নাম দিতে ভয় পেত । সেরা নির্দেশনা , সেরা অভিনেতা , সব আমাদের দল থেকে হয়েছে । এক একটা নাটক দুশো তিনশো এমন কি ছয়শ শো ও হয়েছে । কোথায় না শো করতে গেছি আমরা , টাটা , এলাহাবাদ , সে সব দিন ।

ও , নয়টা বেজে গেছে ,লটারির টিকিট আনতে হবে ,  দোকান বন্ধ হয়ে যাবে , পল্টূ দা , আমি গেলাম ।

পল্টূ দা – হ্যাঁ , যা , আমি আর কি বলব বল । রিহার্সাল এর সময় টা এত কম হয়ে যাচ্ছে । খুব মুশকিল । দেখি , কাল যদি লজ টা খালি পাওয়া যায় । যাবার সময় হুল দা কে জিজ্ঞেস করে যাই । কাল ফাঁকা থাকলে সবাই আসিস। এখন আর কামাই করিস না ।বাৎসরিক উৎসব টা তো করতে হবে।

( পরের দিন ঠিক সন্ধ্যা  সাতটায় রিহার্সাল এর সময় , অথচ যথারীতি ৮ টা বাজলে ও দু তিনজন মাত্র পৌঁছেছে । রিহার্সাল রুম এ পল্টূ দা , ছোটমানা, হাবি আর স্বপন  ।

পল্টূ দা – বাকি রা সব কোথায় ।

পল্টূ দা – স্বপনবাবু , আপনার কি খবর ?

স্বপন – আমি বুড়োর পাঠ টা মুখস্থ করে ফেলেছি ।

পল্টূ দা – বা , এতো দারুণ ব্যাপার  । ঠিক আছে , আপনি একটু বসে পাঠ টা দেখুন , আমি এদের রিহার্সাল টা করিয়ে নিই।

ছোটমানা – কাল তো সবাই জেনে গেল , আজ সবার সময় মত আসা উচিত ছিল ।

পল্টূ দা – এবার থেকে যে দেরি করে আসবে তাকে তাড়িয়ে দেব ।

ছোটমানা – একে ছেলে মেয়ে নেই , তাড়িয়ে দিলে কাকে নিয়ে নাটক হবে ?

পল্টূ দা – তাহলে কি করা উচিত তুই ই বল ।

হাবি – একটা সময় এখানে কত ছেলে ছিল । আর এখন এমন অবস্থা হল যে যাদের নিয়ে রিহার্সাল হবে তারা ই নেই ।

ছোটমানা – কবে ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছি সেই গন্ধ শুঁকে আর লাভ নেই । হাতে আর ঘি এর গন্ধ লেগে নেই । সত্যি , গ্রুপ থিয়েটার এর একটা অভিশাপ আছে। সব দল ই একসময় ভেঙে যায় ।

বিশ্বদীপ – আমার মনে হয় এর একটা PERMANENT SOLUTION খোঁজা উচিত ।আমাদের নাটকের দলের একটা ওয়েবসাইট বানানো উচিত ।

পল্টূ দা – সেটা কি ?

বিশ্বদীপ – যদি অনুমতি দেন তো বলি ।

পল্টূ দা – আজ অনেকে ই নেই , তাই আজ আমি স্বপন কে নিয়ে পরব । চল । বুড়োর পাঠ টা করুন তো দেখি , কেমন করতে পারেন । আচ্ছা আমি সবাই কে তুমি বলি , তোমাকেও তুমি ই বলব , আপত্তি নেই তো ?

স্বপন – না না  আপনার যা ইচ্ছা ।  বসে করব না দাঁড়িয়ে ?

পল্টূ দা – কোন বসে টসে না , আজ থেকে তুমি সব সময় দাঁড়িয়ে রিহার্সাল দেবে , বুঝেছ ?  শুরু কর ।নাও ঢোকো । না না , এভাবে নয় , যে ভাবে একটা বুড়ো আতঙ্কিত হয়ে ঢোকে ঠিক সে ভাবে ।

স্বপন – ” না বাবু , আমি চুরি করি নাই “

পল্টূ দা – বড় ডায়ালগ থেকে শুরু কর ।

স্বপন – ” হা ভগবান । আমি কি কইরে বল্ব । আইজ চাইর পাচডা দিন আমার প্যাটে কিছু পরে নাই । দোরে দোরে ভিখ মেঙ্গে ফিরতিছিলাম । কেউ ভিক্ষে দেলে না । ভাইবলাম বেইচ্যে  থেকে কি লাভ , ইর চেয়ে মরাই ভাল ।

ক্লেন্ত দেহ টেইনে টেইনে ইশটিশন পানে আসতে ছিলাম , রেলের তলায় ঝাপন  দিব। হঠাৎ দেহি বাবুরা মরা নে আসতিছে খই ছিটতে ছিটতে । আমি দেখলাম ঐ তো খাবার , ঐ খই তো আমি পাতি পারি ” ।

পল্টূ দা – থাম , নিজের পাঠ টা বাড়িতে ভালো করে  দেখেছো ?

স্বপন – হ্যাঁ ।

পল্টূ দা – তোমার যা পাঠ , তাতে অভিনয়ের প্রচুর সুযোগ আছে , কিন্তু সেটা ভাল করে ফোটাতে হবে । চার পাঁচ দিন তুমি কিছু খেতে পাওনি , কষ্টে হতাশায় তুমি যে জীবনের প্রতি বিরক্ত হয়ে নিজের প্রাণ টা ই রাখতে চাইছ না , সে টা ফুটিয়ে তুলতে হবে তো ? সেটা হচ্ছে ?  ডায়ালগ খুব তারা তারি বলছ , মিউজিক নাও । ডায়ালগ স্লো বল , মিউজিক ঢুকতে দাও গলার ভয়েস বাড়াও , দর্শক যেন প্রত্যেকটা কথা বুঝতে পারে ,  তার পর মরার সাথে যে খই সেই খাবারের সন্ধান তুমি পেয়েছ , সেটা দেখে মানে চার পাঁচ দিন পর খাবার পেলে চোখ আনন্দে চিক চিক করে উঠবে না ? সেটা কোথায় ? হাত দুটো সব সময় মাথার ওপর অমন তুলছ কেন ? নাও , আবার কর ।

স্বপন – ” হা ভগবান । আমি কি কইরে বল্ব  । আইজ চাইর পাচডা দিন আমার প্যাটে কিছু পরে নাই । দোরে দোরে ভিখ মেঙ্গে ফিরতিছিলাম । কেউ ভিক্ষে দেলে না । ভাইবলাম বেইচ্যে  থেকে কি লাভ , ইর চেয়ে মরাই ভাল । “

পল্টূ দা – “ইর চেয়ে মরাই ভাল ,” ডায়লগে  জোর দাও । অনেক খাটতে হবে , বাড়িতে বার বার অভ্যাস কর । বার বার । তোমার একটা সুবিধা ডায়ালগ গুলো মুখস্থ হয়ে গেছে , এবার সেগুলো কে খেলাও । ক্রিয়েট কর ।

হাবি – সব ডায়লগে হাত দুটো ওভাবে তুলিস না , বাজে দেখাচ্ছে ।

পল্টূ দা – পরের ডায়ালগ বল ।

স্বপন – ” রাস্তা দে খই কুড়োতে কুড়োতে এখানে এসে দেহি , খই এর ঠোঙাটা মরার চালির এক পাশে রেখে দিয়েছে ।ঐ খই এর ঠোঙ্গাটার মধ্যি হাত দিতে ই বাবুরা আমাকে চোর চোর বলে তাড়া কইরল । বাবু গো , আমি চোর না , প্যাটের খিদার চোটে অই খই আমি নিচ্ছিলাম ।

পল্টূ দা –  হারুর ডায়ালগ আমি বলে দিচ্ছি , ” শালারা “

স্বপন – “খোকা ?”

পল্টূ দা – না না , এই খোকা টা এত বড় হবে না , ছোট করে বল , আরও তারা তারি বল । এই খোকা বলার মানে হচ্ছে , হারু যখন শালা রা বলে ছুরি বার করে মারতে যাচ্ছে তুমি ওকে আটকাচ্ছ , এত স্লো বললে হবে ? ওরা মস্তান , ওরা তো ছুরি বার করে চালিয়ে দেবে । এই খোকা বলার মানে তুমি ওকে থামাচ্ছ । পরের ডায়ালগ বল ।

স্বপন – ” না খোকা , আমার জন্য খুনোখুনি করতি হবে না , আমি চলে যাচ্ছি , আমি চলে যাচ্ছি ।

পল্টূ দা –  এবার বুঝতে পারলে তোমার ঐটুকু ছোট্ট একটা ডায়ালগ , ” খোকা ” কত গুরুত্বপূর্ণ ? আর তুমি যখন বলছ ” আমি চলে যাচ্ছি , আমি চলে যাচ্ছি ” তখন মাথার অপর ওভাবে হাত নাড়াতে নাড়াতে যাচ্ছ কেন ? তোমার নিজের মুখ ই তো গার্ড হয়ে যাচ্ছে । ওটা কর না , খুব বাজে লাগছে । হাত গুলো অতিরিক্ত কাঁপছে । বুড়োর অভিনয় করলেই সব সময় অত হাত কাঁপাতে হবে ? তাতে তো HANDICAF মনে হবে । তাছাড়া তুমি সব ডায়ালগ এক ই রকম বলছ । কোন CHANGE নেই , এটা ঠিক না । ঠিক যে ভাবে দেখিয়ে দিয়েছি , সেভাবে PRACTICE কর , বার বার । তোমার অভিনয়ে যদি লোকে না কাঁদে , তাহলে জানবে তোমার অভিনয় হচ্ছেনা । দর্শক কে নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে কাঁদাতে হবে । ঠিক আছে ।

পল্টূ দা – মুখস্থ টা খুব ভাল হয়েছে ,  ভাল করে বাড়িতে অভ্যাস কর , হয়ে যাবে । বিশ্বদীপ , এবার তুই কি বলছিলি বল ।

বিশ্বদীপ – দেখুন পল্টূ দা , আমরা প্রতিদিন সমস্যা নিয়ে বার বার আলোচনা করছি , কিন্তু সমাধানের কথা একবার ও ভাবছি না । এই যে ভাবে এখন চলছে , এটাকে আপনি বন্ধ করতে পারবেন ? মানে এই কয়েকজন মিলে একটা নাটকের দল চালানো , তার মধ্যে আবার নিয়ম করে কারোর না কারোর রোজ ই না আসা , মানে কামাই করা আর কি , এটা কেন হচ্ছে সেই কারণের দিকে আমরা কিন্তু কেউ ই তাকাচ্ছি না ।

পল্টূ দা – কারণ টা কি ?

বিশ্বদীপ – সেটাই তো বলছি । আমরা যারা নাটক ভালোবেসে আজকের দিনে নাটক করতে আসি , এখান থেকে আমাদের কিছু রোজগার হয় ? মানে আমি বলতে চাইছি এই ধরুন একটা নাটক তুলতে মানে তাকে মঞ্চস্থ করার মত করতে অন্তত ছয় মাস লাগে ? সেই সময় টা ছেড়ে দিন , তার পরেও মানে নাটক মঞ্চস্থ হওয়া যখন শুরু হয় তখন ও কি শো বাবদ আমরা কোন ভাল টাকা পাই ? আমরা কিছুই পাই না । অথচ প্রত্যেকে নিজের অফিস ছুটি নিয়ে বা ব্যাবসা বন্ধ রেখে নাটক করতে যাচ্ছি । এমন ও নয় আমরা পাড়ার ক্লাবে নাটক করছি । আমরা তো নাটকের একটা PROFESSONAL দল । লোকে রীতিমতো টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আমাদের নাটক দেখতে আসে , অথচ আমরা যারা শিল্পী তাদের পকেট ঠন ঠন গোপাল ।

আচ্ছা , আপনি একটা কথা বলুন তো , ধরুন আপনার বাড়িতে একটা বিবাহযোগ্য কন্যা আছে , আপনি শুনলেন সে একটি ছেলে কে ভালোবাসে অথচ ছেলেটি  কিছু করে না , আপনি সেই বেকার ছেলের সঙ্গে আপনার  মেয়ের বিয়ে দেবেন ? দেবেন না ।ঠিক তেমন ই খালি পেটে আমাদের এই ভালবাসা ও বেশিদিন টিকবে না । কিন্তু এখান থেকে যদি রোজগারের INTEREST থাকে তখন দেখবেন আপনাকে আর গরু তাড়ানোর মত তাড়াতে হচ্ছে না , রিহার্সালে আয় রে আয় রে বলতে হচ্ছে না , সবাই নিজের INTEREST এ রিহার্সালে আসবে ।

পল্টূ দা – তাহলে তুই কি করতে বলছিস ?

বিশ্বদীপ – আমি বলতে চাইছি সব INDUSTRY র মত এই INDUSTRY তেও টাকা আছে , আমরা PROPER MARKETING টা করছি না , তাই টাকা ও নেই , ছেলে মেয়ে ও নেই ।

ছোটমানা – মানে ?

হাবি – টাকা টা আসবে কোথা থেকে ?

বিশ্বদীপ – সেটাই তো বলছি । আমাদের দলের একটা নিজস্ব WEBSITE করতে হবে ।

পল্টূ দা – সেটা কি ?

বিশ্বদীপ – সেটা একটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ।

পল্টূ দা – সে সব আমাদের পক্ষে করা সম্ভব নয় । আমাদের এই মুহূর্তে কোনো নিজস্ব ক্লাব ঘর ই নেই ।কিছু ই নেই , সব ছন্নছাড়া অবস্থা ।

বিশ্বদীপ – ক্লাবের WEBSITE বানাতে ক্লাবঘর লাগেনা । যে কোনো জায়গায় নতুন ছেলে মেয়ে আসা বন্ধ হয়ে গেলে সেই প্রতিষ্ঠান বেশিদিন টেকে না । নতুন মুখ চাই । ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এর মাধ্যমে আমাদের প্রত্যেক অভিনেতা অভিনেত্রী কে সারা পৃথিবীর বুকে INTRODUCE করতে পারব । প্রত্যেকের একটা সুন্দর পোর্টফোলিয়ো বানিয়ে আজ পর্যন্ত আমরা যে সব কাজ করেছি , যত প্রাইজ পেয়েছি সমস্ত UPLODE করে আমাদের ক্লাবের নিদর্শন প্রত্যেকের সামনে তুলে ধরা যাবে । পুরোনো ছবি , পুরোনো কথা সমস্ত জনসমক্ষে শেয়ার করা যাবে । আর

হাবি – আর কি ?

বিশ্বদীপ – আর সারা ভারতবর্ষে প্রচুর জায়গা আছে যেখানে লোকেরা প্রফেশনাল নাটকের দলের শো দেখতে চায় , তার জন্য তারা ভাল টাকা দিতে রাজি , কিন্তু আমরা কূপমণ্ডূক হয়ে বসে আছি । আমরা কাউকে চিনি না , আমাদের ও কেউ চেনে না । সমস্ত পৃথিবী থেকে আমরা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত । অথচ আজকের দুনিয়ায় প্রত্যেকের হাতে যেখানে্  অ্যান্ডরয়েড মোবাইল সেট সেখানে প্রত্যেক কে আমাদের দলের উপস্থিতি জানান কোন ব্যাপার ই না ।

পল্টূ দা – তা তুই যা বলছিস সে সব খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার , এসব করতে খরচ নেই ?

বিশ্বদীপ – আমার চেনা জানা একজন আছে যে WEBSITE বানায় । আমি REQUEST করলে কম টাকায় করে দেবে । কিন্তু তোমরা রাজি আছ কি না বল?

পল্টূ দা – আচ্ছা , সে পরে দেখা যাবে । এখন রিহার্সাল দিতে শুরু কর।

বিশ্বদীপ – সে দিচ্ছি , কিন্তু পল্টূ দা , বাংলা নাটকের কিন্তু বিরাট বড় একটা মার্কেট আছে । আমাদের যা PERFORMANCE , তাতে AUDIENCE RESPONSE কিন্তু যথেষ্ট ভাল । পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও বাংলাদেশ এমন কি বিদেশে ও প্রচুর বাঙালি থাকে যারা বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে এবং ভাল বাংলা নাটক দেখতে চায় । তারা কিন্তু প্রচুর টাকা ও খরচ করে । একবার আমার কথাটা ভালো করে ভেবে দেখুন । এই যে আমরা খাটছি , পরিশ্রম করছি , আপনি মুখ দিয়ে রক্ত তুলে প্রত্যেকটা চরিত্র কে দাড় করাবার জন্য এত পরিশ্রম করছেন এর নিট ফল কি ? শুধু লোকাল জায়গায় কয়েকটা মাত্র শো ? কোন টাকা পয়সা নেই , পারিশ্রমিক নেই , সামনের দিকে তাকানো নেই , এটা কি ঠিক ? সুযোগ এখন অনেক । প্রত্যেকের আলাদা আলাদা পোর্টফলিও করে আমাদের ক্লাবের সমস্ত কিছু জা আমরা বিগত দিনে অর্জন করেছি সেগুলো ওয়েবসাইটে পোস্ট করে আমরা সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি । শুধু আপনার অনুমতি লাগবে । বাকি আমরা বুঝে নেব ।

পল্টূ দা – আচ্ছা বললাম তো , এখন রিহার্সাল দিতে শুরু কর ।

সবাই রিহার্সাল দিতে শুরু করে , একসময় শেষ হয় । রিহার্সাল এর পর লজের কেয়ারটেকার হুলো দা কে জিজ্ঞেস করে জানা যায় আগামী সাত দিন হল পাওয়া যাবে না ।

পল্টূ দা – ঠিক আছে , এরপর কবে রিহার্সাল হবে আমি তোদের ফোন করে জানিয়ে দেব ।

( সবাই বেরিয়ে যায় )

(বিশ্বদীপ , হাবি , ছোটমানা তিনজন গঙ্গার ধারে একটা বসার জায়গায় গিয়ে বসে। )

হাবি – বিশ্বদীপ , তুই যেটা বলছিস সেটা সম্ভব ?

বিশ্বদীপ – হ্যাঁ , সম্ভব ।

ছোটমানা – কি ভাবে ?

বিশ্বদীপ – ছোটমানা দা , তোমার তো একটা দোকান আছে । ইলেক্ট্রনিকস এর ।

ছোটমানা – ওসব বলিস না ভাই । পড়াশোনা তো করিনি । কোনোরকমে রেডিও্টেপ, টিভি সারানো টা শিখেছিলাম । আর এখানে অনেক কষ্টে এক টুকরো ভাঙ্গা ঘর পেয়েছিলাম । তাতে কোন রকমে মিলের কাজের পর এসে বসি , যা দু পয়সা হয় ।

বিশ্বদীপ – আচ্ছা ,ধর , তুমি যদি চাও তোমার দোকানের কথা সবাই জানুক , তাহলে কি করবে ?

ছোটমানা – কি ভাবে ?

হাবি – কি ভাবে জানবে ?

বিশ্বদীপ – ADVERTISEMENT এর মাধ্যমে । ধর , তুমি যদি তোমার দোকানের একটা সুন্দর নাম দাও । তার পর তার ফ্লেক্স বানাও , লিফলেট ছাপিয়ে বিলি কর , দেওয়ালে পোস্টার লাগাও , বা একটা টোটো একদিনের জন্য বুক করে সারা আতপুরে মাইকিং করলে , তাহলে লোকে জানবে তো ?

ছোটমানা – তা জানবে , কিন্তু আমার দোকান তো অত বড় নয় ।

বিশ্বদীপ – সে জন্যে ই তো । বড় করবে বলে ই তো এসব করতে হবে । এসব করলে তো বড় হবে , এমনি এমনি তো হবে না ।ঠিক তেমন ই ওয়েবসাইট হল ADVERTISE এর একটা DIGITAL PLATFORM । একটু আগে আমি যেগুলোর কথা বললাম , ওগুলো ADVERTISEMENT এর পুরোনো পদ্ধতি , আর এটা একদম আনকোরা নতুন বা সর্বাধুনিক পদ্ধতি বলতে পার ।

ওটার মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট জায়গা এ ADVERTISE করা সম্ভব , আর এটা র মাধ্যমে সারা পৃথিবী তে ।

হাবি – সেটা আবার হয় না কি ?

বিশ্বদীপ – কেন হবে না ? সবাই চাইলেই হবে । একটা কথা কি জান দাদা , প্রচুর পড়াশোনা করার পর কেউ ভাল রেজাল্ট করে ,  আগে ভাল রেজাল্ট করার পর কেউ ভাল করে পড়াশোনা করতে বসে না । এই ওয়েবসাইট , এই পোর্টফলিও এই অনলাইন ADVERTISE এগুলো ভাল পড়াশোনা আর তার ফল হল নাম যশ , টাকা প্রতিপত্তি । কিন্তু আমরা সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ভাল PERFORMANCE থাকা সত্ত্বেও  এক ই জায়গায় পরে আছি ।

(কেষ্ট র প্রবেশ)

কেষ্ট – তোরা সবাই এখানে .

হাবি – হ্যাঁ , এই বসে একটু কথা বার্তা বলছি আর কি ।  বিশ্বদীপ কি একটা ওয়েবসাইটের কথা বলছে ।

কেষ্ট – আমি এতক্ষণ ওর কথা গুলো শুনছিলাম । এটা তো করা যেতে ই পারে ।

হাবি – হ্যাঁ , কিন্তু সবাই রাজি হবে তো । পল্টূ দা কি রাজি হবে ?

বিশ্বদীপ – সেটা তো তোমরা ভাল বলতে পারবে । পল্টূ দা কে তোমরা আমার থেকে অনেক বেশি করে চেন ।

হাবি – তুই যে টা বলছিস সেটা সত্যি করে সম্ভব তো ? আসলে কি জানিস, জুটমিলে কাজ করি । সত্যি কথা বলতে কি আমাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই । ছোট্ট এই মফস্বলে দাদা দিদি দের সঙ্গে অভাবের সংসারে মানুষ হয়েছি । লেখা পড়া টা ও তেমন বলার মত কিছু হল না । তবে হ্যাঁ , যে যাই বলুক , নাটকে অভিনয় টা কিন্তু খুব মন দিয়ে করি । নাটক ভালোবাসি । কিন্তু এটা থেকে তো রোজগার নেই । তাও বাড়িতে বউ মেয়ের শরীর খারাপে ও শো কোনোদিন কামাই করি নি । এমন কি অকারণে রিহার্সাল এ ও আমার কামাই নেই । তুই যা বলছিস তা সত্যি হবে কি না আমি তো জানি না , তবে অভাবের সংসারে এক সপ্তাহ শরীর খারাপ হলে যখন বাড়িতে বসে থাকি , আর রোজগার বন্ধ হয়ে যায় , তখন দিক বি দিক শূন্য মনে হয় । মনে হয় এই নাটক করা যেন বিলাসিতা । অথচ আমরা তো শিল্পী , তাই না বল ?

বিশ্বদীপ – অবশ্যই । থিয়েটার এ যারা অভিনয় করে তারা ই তো সত্যিকারের অভিনয় টা জানে গো । দেখ না , যে কোন নামি DIRECTOR থিয়েটার এর অভিনেতা অভিনেত্রী দের আলাদা কদর করে ।

হাবি – শো করেছি প্রচুর । কিন্তু ভাই , জীবনে বড় কিছু করতে পারলাম না ।

বয়স টা ও দেখতে দেখতে ভাল ই হল । ৫৫ এর উপর , কিন্তু ঐ যে , সংসারের অভাব আর নিজের দুঃখ , সব ভুলে থাকি অভিনয় নিয়ে ।

ছোটমানা – হ্যাঁ রে , আমাদের কথা কে জানবে ? আর কাকে ই বা বলব । একদিন আমার বাড়িতে ঠাকুমা র খুব শরীর খারাপ । নাটকের রিহার্সালে ঢোকার সময় মোবাইল টা সাইলেন্ট করে দিই । রিহার্সাল যখন শেষ হল , মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি ২৯ তা মিসড কল । সামনের ডাক্তারখানা বন্ধ , ডাক্তার না পেয়ে আমাকে ফোন এ না পেয়ে আমার ছোট্ট ছেলেটা ছুটেছিল ডাক্তার আনতে । ভাঁড়ে দু এক টাকা নিয়ে ডাক্তার বাবু কে দিতে ডাক্তারবাবু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল টাকা লাগবে না । সেদিন সেই ডাক্তারবাবু ভগবানের মত উদয় না হলে ঠাকুমা হয় তো আর সে যাত্রায় বাঁচত না । আর ভাল মন্দ কিছু একটা হয়ে গেলে বাড়িতে সারা জীবনের মত অপরাধী হয়ে থাকতাম আমি। তবু নাটক আর নাটক , শো আর শো , প্রথম প্রথম বউ বিরক্ত হত । এখন বুঝে গেছে এ নাটক পাগল মানুষ , একে বারণ করে লাভ নেই । নাটক এ করবে ই ।

কেষ্ট – আমাদের জীবন টা অনেকটা জলছবি র মত , আয়নার ওপর রেখে , ঘষতে ঘষতে ফুটে ওঠে সত্যিকারের চিত্র । কিন্তু ঐ ঘসাটাই আসল । এই বয়সে এসে ও এত গালাগালি খাই কীসের জন্য । মনের খিদে মেটাবার জন্য ই তো ? পেটের খিদে তো যাহোক তা হোক করে মিটে যায় , কিন্তু মনের খিদে ?

ছোটমানা – ঠিক বলেছ কেষ্ট দা । আর সে জন্য ই তো ঝড় জল বৃষ্টি শরীর খারাপ উপেক্ষা করে এত অভাব অনটনের মধ্যেও রিহার্সাল দিই , আর খুঁজে  বেড়াই ওই স্টেজের আলো ।মনে হয় যত রাগ , দুঃখ , ক্ষোভ , অভিমান সব উজার করে দিই নিজের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে । হয়ত আমাদের পোস্টার কোনোদিন কোন দেওয়ালে পরবে না চলচ্চিত্র অভিনেতা দের মত , কিন্তু ঐ যে সামনে বসা মানুষদের হাততালি , উল্লাস , কান্না সব যখন আমাদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় তখন অদ্ভুতভাবে তৃপ্ত হয় মন ।

হাবি – কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা টা বাঁধবে কে ?

কেষ্ট – মানে ?

ছোটমানা – মানে পল্টূ দা রাজি হবে ? আমার মনে হয় না । পল্টূ দা জা গোঁয়ার । কিছুতেই রাজি হবে না ।

হাবি – ঠিক আছে , আমরা সবাই মিলে গিয়ে আগে বলি তো , চল , অনেক রাত হল । কাল আবার সকালে ডিউটি আছে । এবার ওঠা যাক । কাল আমরা সবাই মিলে পল্টূ দা কে বলব ।

( সবার প্রস্থান )

( পরের দিন রিহার্সাল রুম এ সবাই হাজির )

পল্টূ দা – সবাই আছে । এ তো একেবারে অবাক করা কাণ্ড , আজ রিহার্সালে সবাই একসাথে উপস্থিত । একজন ও কামাই নেই ।

ছোটমানা – পল্টূ দা , তোমার সাথে একটা জরুরি আলোচনা আছে । এটা আমাদের সবার REQUEST , তুমি না বলতে পারবে না । একটা বিশেষ ব্যাপারে তোমার সম্মতি চাই ।

পল্টূ দা – এখন আর কার ও কথা শোনার বা আলোচনা করার সময় নেই । এখন শুধু রিহার্সাল হবে ।

নে , আজ প্রথম থেকে রিহার্সাল শুরু করব । বিশ্বদীপ , তুই দর্শকের দিকে পেছন করে , তোর হাতে একটা পুলিশের লাঠি নিয়ে এমন ভঙ্গি করছিস যেন আমাদের মারতে আসছিস । প্রথম ডায়ালগ বলে দর্শকের দিকে ঘুরে যাবি । আচ্ছা শোন  বিশ্বদীপ, ডায়ালগ বলায় তাড়াহুড়ো করবি না । আমি জানি তোর ডায়ালগ মুখস্থ , ডায়ালগ গুলো কে খেলা ,  CREAT কর । আর তোর হাঁটা টা ঠিক কর । ওরকম পা ফাঁক করে বিশ্রী ভাবে হাঁটবি না । এই সাবধান , এই বিশ্রাম , পা দুটো সোজা করে দাড়া । বাঁদিকে ডায়ালগ বললে বাঁ একঙ্গেলে পা ঘুরবে । নে , শুরু কর ।

( এক সময় রিহার্সাল শেষ হয় ) ।

পল্টূ দা – প্রচুর ভুল হচ্ছে । ঠিক কর । টেল ড্রপ হচ্ছে অনেকের , খুব সাবধান , একদম যেন না হয় । আর উজ্জ্বল , তুই এমনভাবে ডায়ালগ গুলো বলছিস যেন সব সময় একটা আতঙ্কে ভুগছিস । সেটা নয় । খুব সুন্দর CHARACTER তোর । ভাল করে  ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা কর । কালা , একটা CATCHING হচ্ছে না । নাটক একটা সাধনার জিনিস , মা সরস্বতী র সাধনা । এই জগৎ টাও সমুদ্রের মত , শিখবার কোন শেষ নেই । বাড়িতে বার বার PRACTIC করতে হবে । সত্যি কথা বল তো , বাড়িতে PRACTIC করিস ? একবার ও বই টা খুলে দেখিস ? দেখিস না । ওভাবে হয় না । রিহার্সাল ভুল গুলো কে সংশোধন করার জন্য । কিন্তু একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী খুব ভাল তখন ই করতে পারে যখন তার ভেতরে ভাল করার সেই খিদে টা থাকে । রিহার্সাল দিচ্ছিস , বেরচ্ছিস , সব ভুলে যাচ্ছিস , আবার পরের দিন সেই এক ই ভুল । ভুল টা বার বার শুধরে দেওয়া সত্ত্বেও ভুল ই থেকে যাচ্ছে । তার মানে কি ? চরিত্র টা নিয়ে ভাবছিস না , পুরটাই দায়সারা হয়ে যাচ্ছে । ঐ চেনা জানা কয়েকজন হাততালি দেবে , তার জন্য নাটক করতে আসা ? আমি বলব করিস না । আগে নিজের প্রতি সৎ হ। সেটা খুব দরকার ।

কালা – ও ঠিক হয়ে যাবে ।

পল্টূ দা – হয়ে যাবে বলে কিছু হয় না । যেটা করবি , সেটা ই হবে । আসলে দোষ টা তোর না , দোষ টা আমার । আমি তো এখন ক্লাস গুলো ই করাতে পারি না । হাঁটা চলা , কথা বলা , টাং টুইসটার , কিছু ই করাতে পারি না । অত সোজা নয় , SERIOUS হ । নাটক মানে মা সরস্বতীর সাধনা করা । চল , আজ যাওয়া যাক । দেখি , হুল দা কে জিজ্ঞেস করে , কবে আবার লজ ফাঁকা পাওয়া যায় ।

( পরের দিন রিহার্সাল রুম এ )

একে একে সবাই এসে জমা হয় । হারু আসে একটু দেরিতে ।

পল্টূ দা – নে হারু , এসেছিস , দাড়া , আজ দাড়ি্যে রিহার্সাল দিতে শুরু করি ।

হারু – পল্টূ দা , একটু দাঁড়াও ।

পল্টূ দা – কেন রে , কি হল ?

হারু – যা দৃশ্য দেখে এলাম । আজ আমার আজ রিহার্সাল দেওয়া হবে না ।

সবাই – কেন রে ?

হারু – আমার দোকান থেকে দু পা এগিয়ে একটা সাংঘাতিক ACCIDENT হয়ে গেছে । একটু আগে । যা দেখলাম , উফ ।

ছোটমানা – ওসব দেখতে যাস কেন ?

হারু – আরে আমি কি বুঝতে পেরেছি না কি ? ছেলেটা কে , সেটা দেখতে গিয়েছিলাম ।

পল্টূ দা – শোন হারু , ৫ মিনিট বসে নে , একটু জল খেয়ে নে , তারপর রিহার্সাল দিতে শুরু কর । আমরা গ্রুপ থিয়েটার এর ছেলে , আমাদের চরিত্র অত ঠুনকো নয় । ভারী ভারী লাইট , রড , শো এর সমস্ত কম বেশি জিনিস পত্র এই কাঁধে বয়ে নিয়ে গেছি । এমন জায়গা যে পেটে একটা দানা ও পরেনি । শুধু এক কাপ চা । আর তারপর ? সেখানে শো করে FIRST PRIZE নিয়ে ঐ ভারী ভারী জিনিস বয়ে রাত ১২ টায় বাড়ি ফিরেছি ।

হারু – সে তো আমিও করেছি । তোমার মনে নেই ? আর মেক আপ গুলো বল একবার ।

পল্টূ দা – সে জন্যেই তো বলছি । কথায় কথায় রিহার্সাল বন্ধ , ওটা আমাদের মুখে মানায় না । যে পরিশ্রম যে কষ্ট আমরা করি , অনেকে ভাবতে ই পারবেনা ।

হারু – হ্যাঁ , অনেকে ই ভাবে জানতো , এরা তো অভিনয় করে । এতে আবার কষ্টের কি আছে ? ভাবে জিনিস টা কত সোজা । আচ্ছা , কেষ্ট আসছে না ?

পল্টূ দা – তাই তো , কেষ্ট কোথায় ?

ছোটমানা – কে জানে , কোথায় ওদের আশ্রম ,শুনতে পাই   নবদ্বীপে  দু-দিন অন্তর ছোটে ।

পল্টূ দা – না , এরকম করলে তো চলবে না । কেষ্ট কে বাদ দেব ।ও বলেও কামাই করছে আবার না বলে ও কামাই করছে । রিহার্সালের জায়গা টা কয়েকজনের কাছে দেখছি ছেলেখেলার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে । তোরা কি বলিস ?

সকলে – তুমি যা ভালো বুঝবে , সেটা ই করবে ।

পল্টূ দা – হ্যাঁ , DICIPLINE সবার আগে । বিশৃঙ্খলা আমি বরদাস্ত করব না ।

হাবি – তাহলে বুড়ো র পাঠ টা ?

পল্টূ দা – তুই যাকে এনেছিস , তাকে দিয়ে অভিনয় করাবো । স্বপনবাবু তো এসেছেন । ঠিক আছে , দাঁড়ান । প্রথম দিকের দাঁড়িয়ে রিহার্সাল টা করে নি , তার পর আজ আপনার টা দেখব । আপনি ততক্ষণে বুড়োর পাঠ টা দেখতে থাকুন।

হারু – কালার কিন্তু…………

ছোটমানা – পল্টূ দা , তুমি একটা কাজ কর , বাদ যখন দেবে ঠিক করেছো , কালা কে ও বাদ দিয়ে দাও। ওর তো মদের ঠেকে মন পরে থাকে , অভিনয় করবে কি ? তোমার ও সুবিধা হবে , একসাথে দুটো CHARACTER দাড় করাবে ।

কালা – ধুর বাল , বড় বড় কথা বল না তো । তোমাদের ভুল হয় না ? একে তাড়াবে , ওকে তাড়াবে , নাটক টা করবে কাকে নিয়ে ? একা একা ?

ছোটমানা – হ্যাঁ , দরকার পরলে একা একাই করব , কিন্তু তোকে তাড়াব ।

কালা – হ্যাঁ রে শুয়ার, তোদের ভুল হয় না , সব ভুল আমার , তাই না ? ভুল সবার হয় । তোদের দুটো হলে আমার দশ টা ।

হাবি – এ কি মিলের দুটো দশ টা ডিউটি হচ্ছে না কি ?

পল্টূ দা – এই , তোরা থাম্ বি ?

কালা – হ্যাঁ , ভুল হচ্ছে দেখিয়ে দাও , তাহলে ই হল , সবাই মিলে পেছনে পরে যাবার কি আছে ?  তুমি ই বল পল্টূ দা ।

পল্টূ দা – ওরে কালা , তুই কি এটা ও বুঝিস না  যে সবাই মিলে তোকে খেপাচ্ছে ? তবে তোর যা অবস্থা , উত্তেজনায় তুই সত্যি সত্যি তোতলা না হয়ে যাস । হা হা হা

কালা – পল্টূ দা , তুমি ও ?

পল্টূ দা – একটু মনটা এখানে দে ভাই ।

ছোটমানা – কি ভাবে দেবে ? ওর মন তো ফেরিঘাটে দিয়ে এসেছে , একটাই তো মন , এটাই তো PROBLEM . দুটো হলে না হয় একটা একটা করে দু জায়গা য় রাখতো । আধখানা তো করা যাবে না ।

কালা – ওসব বলনা , নাটক ভালোবাসি বলে ই এখানে আসি । আমি তো নাও আসতে পারতাম । একটু আধটু নেশা ভান সবাই করে । ওসব ফালতু বলে লাভ নেই ।

ছোটমানা – – পল্টূ দা , তোমার সাথে একটা জরুরি কথা আছে।

– পল্টূ দা – বল না ।

ছোটমানা – কোলকাতা থেকে মানে শ্যামবাজার থেকে অপূর্ব দা ফোন করেছিল । ওদের সাতদিন ধরে একটা বাৎসরিক প্রোগ্রাম আছে । প্রতিদিন তিন টে করে নাটক । ওরা তো আমাদের ক্লাবের এত খবর জানে না যে আমরা কি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি । শুধু বলল আমাদের নবীন সংঘের গুড উইল এর কথা মাথায় রেখে সব দলের একটা নাটক হলে ও ওদের নিজেদের আর  আমাদের জন্য দুটো নাটক বরাদ্দ করেছে । সামনের মাসে শো । আমি আদিম জননী বলে দিয়েছি ।

পল্টূ দা – বাজী তার কথা ও বলে দে । আমরা দুটো শো ই করব ।

ছোটমানা – কিন্তু বাজী র তো এখনও কিছু ই হয় নি ।

পল্টূ দা – কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়া কোন উদ্দেশ্য সফল হয় না । এতদিন আমরা বাজীর রিহার্সাল দিচ্ছি , কিন্তু সামনে কোন নির্দিষ্ট ডেট ছিল না । এবার এসেগেছে । এটা আমাদের সবার সামনে একটা গোল্ডেন অপরচুনিটি কারণ ওখানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দল আসবে । ভালো কিছু করে দেখাবার এটাই সুযোগ । হ্যাঁ , একটা কথা পরিষ্কার শুনে রাখ , কাল থেকে সপ্তাহে ছয় দিন রিহার্সাল । লজ পাওয়া না গেলে আমার বাড়ির ছাদে রিহার্সাল হবে কিন্তু বই আমরা তুলবই ।

ছোটমানা – কিন্তু কালা ?

পল্টূ দা – ওর দোষের পাশাপাশি ওর গুন টাকে কাজে লাগাতে হবে । মদ ওর দোষ হলেও ও কিন্তু রিহার্সাল এ টাইমে আসে , কামাই করে না । কি রে কালা , পারবি না ? ক্লাবের মান সন্মান এখন তোর হাতে ।

কালা – শুধু আমার না , সবার হাতে । শালা , তোমরা ভুল কর না ? যত দোষ নন্দ ঘোষ ?

পল্টূ দা – হ্যাঁ , ঠিক । সবাই খাটলে তবে ই হবে । ঠিক আছে , তাহলে সপ্তাহে একটা দিন বাদে সব দিন রিহার্সাল । কবে রেস্ট সেটা বলে দেব । সবাই রাজি ?

সবাই – রাজি ।

( রিহার্সাল শুরু হয় এবং একমাস কঠোর পরিশ্রম এর পর বাজী নাটকের শো এর প্রস্তুতি শেষ হয় । এবার শো এর পালা । পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পেশাদার নাট্য সংস্থার এই মঞ্চ । সাত দিনে অনুষ্ঠিত হবে ২১ টা নাটক ।আদিম জননী ও বাজী দুটো শো খুব ভাল ভাবে অনুষ্ঠিত হয় । প্রচুর সুখ্যাতি ও সুনাম কুড়োয় নবীন সংঘ । তারপর শেষ দিন পুরস্কার ঘোষণার পালা । মাইকে আনাউন্স হয় – এবারে সারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে যতগুলো নাটকের দল এসেছে তার মধ্যে নাটকে প্রথম স্থান অধিকার করেছে নবীন সংঘের বাজী । সেরা অভিনেতা প্রদীপ মজুমদার (ছোটমানা ) , সেরা নির্দেশনা সমীর ব্যানার্জি (পল্টূ দা ) ।

হারু – অনেক দিন পর আমাদের নবীন সংঘ ঠিকঠাক জেগে উঠেছে ।

হাবি – পল্টূ দা , মিডিয়ার লোকজন এসেছে তোমার সঙ্গে কথা বলবে ।

 পল্টূ দা – মিডিয়া তো কোন বার দেখিনি । এবার হঠাৎ ? ঠিক আছে , নিয়ে আয় ।

মিডিয়া – কেমন লাগছে আপনাদের এই সাফল্য । এটাকে কি ভাবে ব্যাখ্যা করবেন ?

পল্টূ দা – এ সাফল্য আমাদের নতুন কিছু নয় । আসলে আমরা তো নাটক মানে গ্রুপ থিয়েটার করি , আমাদের সাফল্যের বিচার করেন স্টেজের সামনে বসা দর্শকরা । তাদের অভিনন্দন আমরা দীর্ঘদিন অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পেয়ে আসছি । আপনারা মিডিয়ার লোকেরা তাকেই বেশি গুরুত্ব দেন যারা রুপোলী পর্দায় বা টি ভি সিরিয়ালে কাজ করেন । এদিকটা আপনাদের অতটা চোখে না পরলেও অভিনয়ের আতুর ঘর কিন্তু এই গ্রুপ থিয়েটার ।

মিডিয়া – সেটা অনস্বীকার্য । তবে আপনার সঙ্গে আমাদের কথা বলতে আসার বিশেষ একটা কারণ আছে । খোঁজ নিয়ে জেনেছি আপনাদের নাকি এখন নিজস্ব ক্লাব ঘর ও নেই । আমরা প্রত্যেক মিডিয়ার তরফ থেকে আপনাদের এই লড়াইকে কুর্নিশ জানাই । নির্দিষ্ট ক্লাব ঘর ছাড়াও এমন PRODUCTION যে করা যায় তা আপনারা আজ দেখিয়ে দিলেন । আপনাদের এই PERFORMANCE আগামী প্রজন্মের কাছে একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে । উই স্যালুট ইউ । অসাধারণ আপনার নির্দেশনা । সেরা অভিনেতা ও অসাধারণ ।

পল্টূ দা – এ সাফল্য তো আমার একার নয় । একটা দলগত প্রচেষ্টার ফল ।

মিডিয়া – আপনাদের কোনো কার্ড আছে , বা ওয়েবসাইট ? আপনাদের যা PRODUCTION তাতে আপনারা প্রচুর শো পাবেন । এবং সেই সঙ্গে ভাল টাকা ও ।

ছোটমানা – সত্যি আমরা টাকা পাব ? আমরা তো নাটক করি নিজের টাকা আর সময় বন্ধক রেখে । দিনের পরদিন চলে যায় , সুদে আসলে তা এমন জায়গায় চলে যায় যে ফেরত পাওয়া বা ছাড়ানো কোনোটাই সম্ভব নয় ।

মিডিয়া – বা , আপনি তো খুব সুন্দর কথা বলেন ।

ছোটমানা – বলে কি হবে বলুন , শুধু কথায় তো আর পেট ভরে না ।

মিডিয়া – আপনাদের একটা সু খবর দিই । বিশিষ্ট শিল্পপতি শ্রী উমাশঙ্কর মুখোপধ্যায় আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন ।উনি আজ  আপনাদের PERFORMANCE দেখে আপনাদের সাথে কথা বলতে আগ্রহী । সমীর বাবু , উনি আধঘণ্টা পর আপনাদের সাথে কথা বলতে আসবেন । অনেক ধন্যবাদ আপনাদের আমাদের সময় দেবার জন্য ।

পল্টূ দা – আপনাদের ও অনেক ধন্যবাদ । নমস্কার ।

( মিডিয়ার প্রস্থান )

মিডিয়া চলে যাবার ঠিক আধ ঘণ্টা পর উমাশঙ্কর বাবু তার SECRETARY দিলিপ বাবু কে নিয়ে প্রবেশ করলেন।

দিলিপ বাবু – পরিচয় করিয়ে দিই , ইনি হলেন আমাদের স্যার , এনাকে নিশ্চয়ই আপনারা চেনেন । আর স্যার , ইনি হলেন নবীন সংঘের নির্দেশক সমির ব্যানারজ্জি ।

পল্টূ দা – বসুন ।

উমাশঙ্কর বাবু – আমি আপনাদের নাটক দেখেছি ।আমার ভাল লেগেছে  । সমির বাবু , নবীন সংঘের আপনি তো কর্ণধার ।

পল্টূ দা – ঐ আর কি ।

উমাশঙ্কর বাবু – আমি আপনাদের ক্লাব কে SPONSOR করতে চাই । যেমন নামি দামি ক্লাবের সঙ্গে হয়ে থাকে ।

 পল্টূ দা – কিন্তু নাটকে  SPONSOR তো এখানে দেখিনি বা শুনিনি ।

  উমাশঙ্কর বাবু – হ্যাঁ , এখানে নেই , কিন্তু সব কিছুর তো একটা শুরু আছে ।  এতে আপনারা আর্থিক ভাবে লাভবান হবেন , আরও মন দিয়ে অভিনয় টা করতে পারবেন । নাটকের দলের কোন SPONSOR এখানে নেই । আমরা এটা এখানে FIRST শুরু করতে চাই । তাতে আমরা উভয় পক্ষ ই উপকৃত হব । আমার SECRETARY  দিলীপ আছে , ও আপনাদের সব বুঝিয়ে দেবে ।আচ্ছা , আজ আমার একটু তাড়া আছে , আমি চলি , নমস্কার ।

 পল্টূ দা – নমস্কার ।

উমাশঙ্কর বাবু চলে যান ।

দিলীপবাবু – স্যার , আপনি তাহলে আপনাদের সময় মত একটা ডেট দিন , আমি আপনাদের কাছে গিয়ে সমস্ত ব্যাপার টা CLEAR করে সব  FORMALITY COMPLETE করে আসব ।

পল্টূ দা – ঠিক আছে । আমাকে দুটো দিন সময় দিন , তার পর ফোন করুন ।

দিলীপবাবু – ওকে স্যার , তাই হবে । তাহলে আজ আমি চলি , নমস্কার ।

পল্টূ দা – নমস্কার ।

(দিলীপবাবু বেরিয়ে যায় )

পল্টূ দা – নে , এবার সব গোছা । আমাদের বেরোতে হবে তো ।

হারু , ছোটমানা – হ্যাঁ , চল ।

(সবার প্রস্থান)

( পরের দিন রিহার্সালে )

পল্টূ দা – নে , সবাই আছিস । পরের শো এসেগেছে । ভালো করে  রিহার্সাল দে ।

ছোটমানা – পল্টু দা , কাল যে এত বড় একটা প্রস্তাব এল , সেটা নিয়ে তো তুমি কোন আলোচনা করলে না ?

হাবি – হ্যাঁ , ওরা তো SPONSOR করতে রাজি ।

হারু – ওদের কার্ড তো তোমাকে দিয়েছে , ফোন করে দিলীপ বাবু কে ডাক ।

পল্টূ দা – তোরা এত তাড়াহুড়ো করছিস কেন ?

ছোটমানা – তাড়াহুড়ো নয় , ওদের সঙ্গে কথা বলতে দোষ কি ?

পল্টূ দা – ওসব করে কি হবে ? আমরা নিজেদের মত ঠিক আছি ।

বিশ্বদীপ – ঠিক নেই ।

পল্টূ দা – অ্যাঁ

বিশ্বদীপ – ঠিক নেই পল্টূ দা । এটা একটা সুযোগ ।সুযোগ কিন্তু বার বার আসেনা । আজ আমাদের কাছে এসেছে , আমরা যদি সুযোগ না নিই কাল সেটা অন্য কেউ লুফে নেবে ।তখন আমরা সারা জীবন শুধু আফসোস করে কাটাব ।আশাকরি  এটা আপনি হতে দেবেন না , PLEASE .

পল্টূ দা – আচ্ছা বিশ্বদীপ , তোর কি মনে হয় ? ওদের সঙ্গে মিলে গেলে আমাদের বিরাট কোন লাভ হবে ?

বিশ্বদীপ – ক্ষতি টা ই বা কি হবে ? আপনি বলুন আমাদের কি হারাবার আছে ?

পল্টূ দা – তবুও আমাকে ভাল করে ভাবতে দে ।

ছোটমানা -সে তুমি ভাব , কিন্তু দিলিপ বাবু কে ডেকে ভাল করে সবটা শুনে তো নাও ।

পল্টূ দা – সে হবে খন , এখন ভাল করে রিহার্সাল দে ।

বিশ্বদীপ – পল্টূ দা , সঠিক সময় এ সঠিক সিদ্ধান্ত না নেবার জন্য নোকিয়া র মত কোম্পানি কিন্তু মোবাইল মার্কেট থেকে হারিয়ে গেছে ।

সবাই – এই সুযোগ ছাড়া টা ঠিক হবে না । তুমি পারমিশন দাও ।

( কি হল এর পর ? পল্টূ দা কি পারমিশন দিলেন ? তিনি সেরা নির্দেশক , সেরা অভিনেতা তৈরি র কারিগর ও বটে । কিন্তু বাংলা গ্রুপ থিয়েটার এর জন্য তিনি কতটা দূরদর্শিতা দেখাতে পারলেন ? চালাবেন একই ভাবে তার পুরোনো পাঠশালা ? করবেন সেই ভাবে ই মা সরস্বতী র আরাধনা না নতুন সিদ্ধান্তের হাত ধরে নিজেদের সাজানো সংসারে করবেন মা লক্ষ্মী কে ও বরন ।এর উত্তর আমরা কবে কোথায় পাব ? আসুন দেখি ।

দিলীপবাবু – আসতে পারি ?

পল্টূ দা – আসুন আসুন , বসুন , এবার বলুন শুনি ।

দিলীপবাবু – আসলে আপনাদের পুরো মার্কেটিং টা আমরা করব । মানে শো আমরা আরেঞ্জ করব । থাকা , খাওয়া , যাতায়াত , কস্টিউম , বছরে একটা টাকা , এমন কি মেডিক্লেম ও , সব দায়িত্ব আমাদের , আপনাদের কাজ শুধু মন দিয়ে অভিনয় টা করে যাওয়া । আর বিশেষ বিশেষ জায়গায় আমাদের কোম্পানির প্রচার এ অংশগ্রহণ করা । আপনাদের বছরে মুখ্য অভিনেতা রা ৩ লাখ করে আর পার্শ্ব অভিনেতা রা ২ লাখ করে পাবেন । এটা বছরের অ্যাগ্রিমেন্ট , প্রতি বছর বাড়বে । প্রাইজ মানি আপনাদের । আপনাদের এতে কোন INSECURITY FILLING হবে না । প্রথমে আমরা আপনাদের CHARACTER WISE স্পেশাল ছবি তুলিয়ে পোর্টফলিও বানাব তার পর ব্র্যান্ডের ওয়েবসাইট করে সেটা PROMOTE করে আমরা দেশ বিদেশ থেকে শো ধরব । এর মধ্যে আমরা একটা ACCTING SCHOOL ও করব । যেখানে বাচ্চাদের খুব স্বচ্ছ ভাবে অভিনয় শেখান হবে ।আপনাদের সিনিয়র মোস্ট কয়েকজন সেখানে টিচার হিসেবে থাকবেন । এই হচ্ছে পুরো পরিকল্পনা , এমন কি ভবিষ্যতে যদি ফিচার ফিল্ম বেরোয় সেখানে ও আপনারা অগ্রাধিকার পাবেন । কেমন লাগ্ল ?

পল্টূ দা – খুব ভাল । আচ্ছা , আমাদের পরের শো কি আপনারা ঠিক করবেন ?

দিলীপবাবু  – ঠিক করা হয়ে গেছে স্যার । শুধু আপনাদের সঙ্গে অ্যাগ্রিমেন্ট টা বাকি ।

ছোটমানা – কোথায় পরের শো ?

দিলীপবাবু  – আমেরিকায় , নিউ ইয়র্কে ।

হারু – আমেরিকায় ?

দিলীপবাবু  – অবাক হওয়ার কিছু নেই । অ্যাগ্রিমেন্ট হয়ে গেলে ই আপনারা পাসপোর্ট বানাতে দিয়ে দিন , আমাদের লোক আছে । আপনারা DOCUMENTS নিয়ে বসলেই ও FORM FILL UP করে দেবে । আরে না না , বললাম না , এখন থেকে আপনাদের সব দায়িত্ব আমাদের । আপনাদের একটা টাকা ও লাগবে না । সমিরবাবু , আমার আপনাদের কাছে একটা REQUEST আছে ।

পল্টূ দা – বলুন ।

দিলীপবাবু  – প্রস্তাবে রাজি থাকলে সময় নষ্ট না করে অ্যাগ্রিমেন্ট তা করে ফেলুন । তাহলে আমরা প্রফেশনালি পুর কাজ টা শুরু করে দিতে পারি ।

পল্টূ দা – ঠিক আছে , ডেট টা ঠিক করে ফেলুন । ( সবাই কে ) কি রে , তাই তো ?

সবাই – হ্যাঁ ।

পল্টূ দা – তবে আমার একটা শর্ত আছে ।

( সবাই সবার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকায় )

দিলীপবাবু  – বলুন

পল্টূ দা -পল্টূ দা – যত টাকা ই দিন বা এ চুক্তি হোক বা না হোক , আমরা কিন্তু তামাক বা অ্যালকোহল জাতীয় কোনো কিছুর বিজ্ঞাপন করব না ।  ।  

দিলীপবাবু – বেশ , তাই হবে ।  আমি চেষ্টা করছি সব ফর্মালিটি কমপ্লিট করে পরশু দিন যাতে অ্যাগ্রিমেন্ট করে ফেলা যায় । আজ তাহলে আমি চলি ।নমস্কার ।

( কথা মত অ্যাগ্রিমেন্ট হয়ে যায় , প্রফেশনালি পুরো কাজ টা শুরু হয়ে যায় , এর মধ্যে একদিন পল্টূ দা সবাই কে নিয়ে বিকেল বেলা আতপুর বাজারের পাশের গলি দিয়ে যেতে গিয়ে দেখে কান কাটা পাচুকে ।একা , বিধ্বস্ত , সঙ্গে কেউ নেই , কাঁদ কাঁদ মুখে বসে ।)

পল্টূ দা – কি রে ? পাচু না ? কি হয়েছে তোর ? এখানে একা একা বসে কাঁদছিস কেন ?

পাচু – ও কিছু না । ও তুই , না রে ভাই , কিছু না । তোদের খবর তো কাগজে বেরিয়েছে । সত্যি পলটে , তোর দম আছে ।

পল্টূ দা – ও সব থাক , তোর মত ছেলে , কাঁদছে ? কেন ?

পাচু – মাকে মনে হয় আর বাঁচাতে পারব না রে । খুব কঠিন রোগ , অনেক খরচ ।

পল্টূ দা – মাসিমা এখন কোথায় ?

পাচু – কোথায় আবার ? বাড়িতে । আমাদের জীবনে যা হয় । আমার মা , কানকাটা পাচুর মা , মরে গেলে কার কি যাবে । ভদ্রলোক দের মা হলে না হয় ……

পল্টূ দা- আর তোর সঙ্গী রা ।

পাচু – ঐ শুয়োরের বাচ্চা নেতার কথায় একটা PROMOTARY CASE এ ঝামেলা করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পরে সব কটা জেলে , আমি ছিলাম না তাই আমাকে ধরতে পারেনি ।

পল্টূ দা – তুই বাড়ি যা , আমি দশ মিনিটে আসছি ।

পাচু- তুই আসবি ? কেন রে ? এই সেদিন ও তো ……

পল্টূ দা – যা বলছি শোন , বাড়ি যা ।

( পাচু চলে যায় )

ছোটমানা – তুমি ওর বাড়িতে যাবে ?

হাবি – সেদিন এরা ই আমাদের ক্লাবঘর ভেঙ্গেছিল পল্টূ দা ।

হারু – আমাদের গরু ছাগল এর মত পিটিয়েছিল রাস্তায় ফেলে , ভোজালি চালিয়েছিল ।

পল্টূ দা – কতটুকু জানিস পাচু সম্পর্কে ? কার জীবনে যে কি হয় ? হা ভগবান । এক সময় ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট ছিল এই পাচু । নকশালে যোগ দিল , যার সাথে প্রেম ছিল তাকে দেখতে ছিল ফিল্মসটার দের মত । একদিন পুলিশের গুলি পাচুর কান ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল , প্রাণে বেচে গেলে ও কান কাটা রয়ে গেল , নাম হল কান কাটা পাচু । মেয়ে টা এক ব্যাংকের ম্যানেজার কে বিয়ে করে চলে গেল । ওর বাবা , মানে মেসোমসাই ও মারা গেলেন , ব্যাস , বলার কেউ রইল না , যত রকমের নেশা , আর মেয়েছেলের চক্করে পরে আজ তোরা জা দেখছিস , গুন্ডা , এলাকার  ত্রাস , কান কাটা পাচু । একটা সময় ছিল , আমি ওর বাড়ি গেলে মাসিমা আমাদের দুজনের ভাত বাড়ত , আর সেই ভাত খেয়ে আমরা হাত ধরা ধরি করে স্কুলে যেতাম ।

ছোটমানা – এসব কথা তো তুমি …।।

পল্টূ দা – আগে বলিনি ? তাই তো ? নে , এবার শুনলি তো , বল , এখন কি করা উচিত ।মনে রাখবি , আমরা শিল্পী , আমরা ক্রিমিনাল নই , তাই যা বলবি চিন্তা ভাবনা করে বলবি ।

হারু – পল্টূ দা , কাল অবধি আমাদের কিছু ই ছিল না, আজ তো কিছু একটা হয়েছে , চলনা দেখি , মাসিমা কে চাঁদা তুলে ও যদি বাঁচান যায় ।

হাবি , ছোটমানা – হ্যাঁ  পল্টূ দা ।

পল্টূ দা – এই তো চাই , সাব্বাস । কটা শো করলাম সেটা বড় কথা নয় । বড় কথা দিনের শেষে নিজের বিবেক কে কি জবাব দিলাম । চল ।

( সবাই মিলে টাকা তুলে পাচুর মা এর চিকিৎসা করায় , পাচুর মা ভাল হয়ে ওঠে ) ।

পাচু – সত্যি পলটে , তুই সেই আগের মত ই আছিস , তুই না থাকলে আমার মা আজ বেঁচে থাকত না রে । যাদের সাথে এক গ্লাসে কত রাত কাটিয়েছি তারা এখন কোথায় ? অথচ তুই ।

পল্টূ দা – আসলে কি জানিস ভাই , আমরা তো গ্রুপ থিয়েটার করি , সিনেমা তে রি টেক  মানে আবার সুযোগ পাওয়া গেলে ও থিয়েটার এ   সুযোগ একটা ই ,  জীবনের মত । কোন রি টেক নেই । তবু তোকে বল্ব, ঐ রাস্তায় হেঁটে তো দেখলি , কিছু পেলি ? উল্টে নিজের মা কে হারাতে বসেছিলি । ও সব ছাড় , তোর কাজের অভাব হবে না । সৎ রাস্তায় বাঁচ , দেখবি পোড়া রুটি খেলে ও সুখ , কেউ কথা শোনাবার নেই । পারবিনা ?

পাচু – পারতে তো হবে ভাই , তোরা যদি পারিস ঐ জায়গা থেকে উঠে প্রাইজ আনতে তাহলে আমাকে ও পারতে হবে ।

সবাই – কোরাস – গ্রুপ থিয়েটার মানে একাকী নয় । এটা একটা সমবেত প্রচেষ্টা র আন্দোলন । সমাজ কে আয়না দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়া নয়  , আমরা সমাজ সংস্কারক । আসুন , শিল্প কে বাঁচাতে , সংস্কৃতি কে বাঁচাতে , বাচ্চাদের হাতে মোবাইল নয় , বই তুলে দিন , দেখান এমন নাটক , যাতে তারা হয়ে উঠতে পারে নিজেরা ই এক এক জন আমাদের সমাজের আদর্শ ।

WE SHALL OVER COME SONG …………

                                     সমাপ্ত

Leave a Reply